অভিনব কায়দায় যৌতুক দেয়া ও নেওয়া বন্ধ করুন, যৌতুক বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলুন

যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি, যৌতুক আমাদের সামাজিক, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে।

আবদুল মোতালেবআবদুল মোতালেব
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:১৭ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০২১

প্রতীকি ছবি

বিয়ের সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছেলেপক্ষ যখন কন্যাপক্ষের কাছে কোনো কিছু দাবি করে সেটিই যৌতুক। এটা নগদ অর্থ, সম্পদ কিংবা অন্য কোনো বস্তুও হতে পারে। এ ধরনের প্রবণতা বিয়ের আনন্দ ম্লান করে দেয়। পারিবারিক কলহের সৃষ্টি করে। পরবর্তী সময়ে নারী নির্যাতনে রূপ নেয়।

ইসলামি জীবন বিধানমতে মেয়ের পক্ষ থেকে ছেলেকে বিয়ের সময় বা তার আগে-পরে শর্ত করে বা দাবি করে অথবা প্রথা হিসেবে কোনো দ্রব্যসামগ্রী বা অর্থ-সম্পদ ও টাকাপয়সা নেওয়া বা দেওয়াকে যৌতুক বলে। শরিয়তের বিধানে যৌতুক সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ এবং কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ।

আচ্ছা, বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে গিফট, উপটৌকন হিসেবে যৌতুক নেয়াকে কি আপনি সমর্থন করেন?

আমি-আপনি যদি বিশ বছরের একটা মেয়েকে বিয়ে করি, তাহলে কম করেও যদি বছরে এক লাখ টাকা করে হিসেব করি, তাহলে মেয়ের পেছনে মা-বাবার কষ্টার্জিত উপার্জনের বিশ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আর ত্রিশ বছরের মেয়ে হলে ত্রিশ লাখ টাকা। একটা মেয়েকে তার মা-বাবা এতো বছর লালনপালন করে আমার আপনার মতো ছেলের জন্য।

আমার-আপনার সামর্থ্য থাকলে টাকাটা মেয়ের বাবাকে আগে পরিশােধ করে, তারপর তার মেয়েকে বিয়ে করা উচিত। কিন্তু আমরা সেটা তো করা দূরের কথা উল্টো মেয়েদের থেকে দাবি করি, লজ্জা থাকা উচিত।

আমি পরের বাড়ির ফার্নিচার আমি কেন নিব? আমরা ঘরে কি ঘুমানোর জন্য খাট নাই? বস্তুতপক্ষে আমি মনে করি, একজন বাবা-মা একটা মেয়েকে পরম যত্নে লালন-পালন করে। শিক্ষিত এবং যােগ্য করে গড়ে সমস্ত দাবী তুলে নিয়ে মেয়েকে একটা ছেলের সাথে বিয়ে দেয়। সেই বাবা’ই আবার কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা হিসেবে নিজের বাকি জীবনে ঋণগ্রস্ত বনে যান মেয়ের বিয়ের আয়ােজন করতে গিয়ে। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে অমানবিক আর অযৌক্তিক নিয়ম।

আচ্ছা, যে ছেলেপক্ষরা বিয়ের সময় কনেপক্ষের কাছ থেকে ফার্নিচার নেয়, তারা কি খাটে ঘুমায় না? তাদের বাসায় কি কোন ফার্নিচার থাকে না? যদি না থাকে তাহলে পরের বাড়ির ফার্নিচার এনে ফুটানি দেখানাের কোন মানে হয়না। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন কোন ছেলেরই এমন ব্যাপারগুলো সমর্থন করা উচিত না।

আর যে মেয়ের বাবা-মা মনে করেন এসব দিলে শশুরবাড়িতে মেয়ের দাম বাড়বে। তারা কি জানে? মুলত এইসব জিনিসই মেয়েটার গুনাবলী আর যােগ্যতাকে লেনদেনের কাঠগড়ায় এনে মেয়েটাকে পন্যের সমান করে দিচ্ছে। আর এভাবে মেয়ের দাম আর যৌতুক রুপী উপহারের বিনিময়ে, আর ছেলেপক্ষ যে আসলে নিজেদের আত্মসম্মানবােধকে নিলামে তুলে মূলত ছেলেটাকে বিক্রী করছে, এটা তারা কেন বােঝে না!

যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। যৌতুক আমাদের সামাজিক, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে। একটি সাজানো-গোছানো সুখী পরিবার যৌতুকের কারণে বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাচ্ছে। দুগ্ধপোষ্য শিশু ইয়াতিম হচ্ছে, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর জীবন নষ্ট হচ্ছে। ভাঙছে সংসার, ধ্বংস হচ্ছে সমাজ, নষ্ট হচ্ছে সম্ভ্রমবোধ সম্প্রীতি।

সরকার ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন প্রণয়ন করেছে। ২০০৫ সালে এটাকে একটু সংস্কার করে পারিবারিক নির্যাতন আইন হিসেবে প্রণয়ন করা হয়। ২০১৮ সালে যৌতুক নিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যৌতুকের অপরাধ একটি অজামিনযোগ্য অপরাধ। এ ব্যাপারে পাঁচ বছরের জেল এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। অথচ এটা ঠেকানো যাচ্ছে না। কারণ কেউ কিন্তু সরাসরি যৌতুকের কথা চিন্তা করে না।

যৌতুক নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, যৌতুক নিয়ে ২৫৬টি মামলা হয়েছে এবং যৌতুকের কারণে ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ব্যাধি আমাদের পারিবারিক জীবন বিষিয়ে তুলেছে। যৌতুক আমাদের সামাজিক জীবনের একটি অভিশাপ। এ অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে দিন দিন বাড়তেই থাকবে।

প্রত্যেকটা বাবা-মায়ের আদরে লালিত প্রত্যেকটা মেয়েই নিজ গুনে অনন্যা, কিন্তু বিয়ের সময় তাকে পন্যের সাথে তুলনা করে। অভিনব কায়দায় যৌতুক দেয়া বন্ধ করুন।ইসলামে আছে, যে বিয়েতে খরচ কম হয় সে বিয়ে তত বরকতময়। যৌতুক বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলুন।

আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করেন।

কলামিস্ট; আবদুল মোতালেব, সহকারী সম্পাদক ভয়েস অফ ইনসাফ

আপনার মতামত লিখুন :