“মৃত্যুর পরে নয়, জীবিত থাকা অবস্থায় প্রশংসা করুন” আবদুল হালিম

ভয়েস অফ ইনসাফ ডেস্কভয়েস অফ ইনসাফ ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:৩০ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০২১


মানুষ তার কর্মের স্বীকৃতি চায়, কেউ পায় কেউ পায় না। আবার অনেকেই আছেন নীরবে নিভৃতে নিজের কাজটা করতে পছন্দ করেন। কাজই তার হয়ে কথা বলবে, এই বিশ্বাসটা হৃদয়ে পোষেণ। কিন্তু তা আর হয় না, কাজ যেমন মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না, তেমনি কাজের সুফল ভোগ করা দেশ ও জাতিও পারে না সে কাজের মূল্যায়ণ করতে, কাজের হয়ে কথা বলতে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আলেম-ওলামা ইসলামিক স্কলারগণের কদর খুব কমই হয়। কতই না জ্ঞানী, গুণি, বিজ্ঞজন অনাদর আর অবহেলা সয়ে দিনযাপন করছেন, পরপারে পারি জমিয়েছেন। কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, যখন দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল।

বাংলাদেশে আলেম সমাজের কদর হয় না এটা স্বীকৃত বিষয়। একেবারেই যে হয় না তা নয়। তবে কদরের জন্য বিশেষ কেউ হতে হয়, আর এই বিশেষ কেউ হওয়ার সূত্র শুধুই সাধারণ কেউ নয়। অনেক জ্ঞানের পাশাপাশি ধর্ণা দিতে হয় দলীয় কর্মী দলীয় সাইনবোর্ড বা সংশ্লিষ্টদের আস্থাভাজন হতে হয়, তবেই জুটতে পারে জীবিত থাকাবস্থায় স্বীকৃতি। আবার অনেক সময় দেখা যায় গুণি/ আলেম ব্যক্তিটি শারীরিক ভাবে নিস্তেজ হয়ে পরলে কোন বিশেষ পরিচয়েও তার মূল্যায়ন হয় না। এক সময়ের যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম বা দ্বীনদার ধার্মিক বার্ধক্য হয়ে যায় দূর্বিষহ। যথাযথ সম্মান, মান মর্যাদা সে পায় না। বেঁচে থাকতে নিজ কর্মের জন্য সমাদৃত হয় না। বেঁচে থাকতে অনাদর অবহেলা ও স্বীকৃতিহীন জীবন যাপন করে গেলেও মরনের পর মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের আহ্লাদীপনার শেষ নেই। মরনোত্তর পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়, দেয়া হয় নানা পদক, সম্মাননা। মানুষের মুখে মুখে থাকে তার নাম, তার কর্মের গুণগান। কতই না কাব্যিক ভাষায় মৃত ব্যক্তিকে স্মরণ করা হয়। দু একটি উদাহরণ আল্লামা শাহ আহমদ শফী আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ এর পরেই জগৎ বিখ্যাত একজন আলেম বিদায় নিয়েছিলেন শায়খুল হাদিস আব্দুস সালাম চাটগামী রহ.।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আব্দুস সালাম চাটগামী সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের জীবন থাকায় অবস্থায় তেমন ধারণাই ছিল না তিনি মৃত্যুবরণ করার পরে তার সমস্ত প্রশংসা ভেসে উঠেছে,কিন্তু লাভ কি হইছে? তিনি তো আমাদের মাঝে নেই, তিনি যে কত বড় একজন আলেম ছিল সেটা আমরা তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় বুঝিনি। গত ২৯ নভেম্বর বিদায় নিলেন হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা হাফেজ নুরুল ইসলাম জিহাদী রহ.। গতকাল পর্যন্ত উনার কোন প্রশংসা কোন আলেমের মুখে শুনিনি, মারা যাওয়ার পরে আজ গণমাধ্যমে তাঁরই প্রশংসা ভেসে উঠেছে, তিনি জাতির একজন দরদী রাহাবার ছিলেন। এরকম আরো অসংখ্য অগণিত উদাহরণ আমার হাতে আছে।

কিন্তু জীবিত থাকতে যতনা আলোচনা হতো, তারচেয়ে শতগুণ বেশি আলোচনা, প্রশংশিত হন মৃত্যুর পরে। যদিও আলেম ওলামা ও ভালো মানুষ হলে মৃত্যুর পরেও মানুষের ভালোবাসা পাবেন, তা কাম্যই। কিন্তু বেঁচে থাকতে নানা সমালোচনার শিকার হওয়া, আর্থিক অসহায়ত্বে ও চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করার পর প্রশংসায় ভাসিয়ে দেয়া, শোকবার্তা দেয়া, সম্মাননা দেয়ার মতো উপহাস ও নিষ্ঠুরতা আর কিছুই হতে পারে না।

আমাদের দেশে আলেম-ওলামা ও ধার্মিক মানুষের এতোই অবহেলা করা হয় যে, দেশপ্রাণ ইসলামী প্রেমিক মৃত্যুর পরে সরকার বাহাদুর একটি শোকবার্তা পর্যন্ত দেয়না, কিন্তু আমরা দেখি গায়িকা-নায়িকা ফেসবুক সেলিব্রেটি যাদের কোনো অবদান নেই রাষ্ট্রের ইসলামের তাদের জন্য সরকারি শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়। “যে দেশে গুণী জনের সম্মান নেই’ সে দেশে গুণীজন পরবর্তী প্রজন্মে জন্ম নেয় না”। আবার সামাজিক ও নাগরিক জায়গা থেকেও আলেম-ওলামা সত্যিকারের গুণীজনের অবহেলা করা হয়, যার কর্মে মুগ্ধ হই, অনুপ্রানিত হই, এগিয়ে যাই, তার খোঁজ খবর নিইনা। কেমন আছে জানতে চাই না। কিন্তু মরে গেলে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেই, সম্মানিত করার দাবি তুলি। কেনো জীবিত থাকতে মূল্যায়ন করা হয়নি, তার জন্য দায়িত্বশীলদের দোষারোপ করি। নিজেদেরও ন্যূনতম দায়িত্ব ছিল তা মনে করি না। আমার কি মনে হয় জানেন? ভালো লোক কে তা মরে প্রমাণ করতে হবে।

আমার পরিচিত একজন প্রবীণ স্কুলের শিক্ষক মহাদয় লিখেছেন: আমার মন বলে, আমি লিখেছি-আমার কর্মে আমি তোমাদের মাঝে বিশেষ একজন হিসেবে বিবেচিত হয়েছি, তোমাদের মুখে ছিলো আমার নাম, ছিলো আমার কর্মের প্রশংসা। কিন্তু আমার বার্ধক্যে, বিপদে পাইনি কোন সহায়তা, পাইনি কোন সহানুভূতি, সহমর্মিতা, অবহেলায় অযতনে মৃত্যুই আমার শেষ গন্তব্য হয়েছে, নেয়নি কেউ খোঁজ, পাইনি কোন স্বীকৃতি সম্মান। বেঁচে থাকতে আমাকে সম্মান না দিয়ে, সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকতে সহায়তা না করে, আমার মরনের পর আমার কর্মের প্রশংসা করবে।

তিনি এই ছিল, সেই ছিল, চাইনা এমন প্রশংসার বাণী। আমার মরনের পর কবর ফুল দিয়ে সাজাবে, আমি কি তা দেখবো শুয়ে কবরে? চাইনা এমন ভালোবাসা, চাইনা এমন শ্রদ্ধা জীবদ্দশায় আমার কোন কাজে যদি তোমাদের সন্তুষ্ট করতে পারি, তার প্রতিদান দিতে চাইলে দিও বেঁচে থাকতেই, মরণের পর চাইনা কোন স্বীকৃতি সম্মান।

সর্বশেষ এতটুকু বলব জীবিত থাকা অবস্থায় আমরা সম্মান দিতে শিখি মৃত্যুর পরে নয়। যারা দুনিয়া থেকে চলে গেছে সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। যারা জীবিত আছেন উনাদের দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করে।

 

মাওলানা আবদুল হালিম, সম্পাদক: ভয়েস অফ ইনসাফ

আপনার মতামত লিখুন :